সাইরেন বেজে ওঠার শব্দ কখনও কখনও শুধু একটি শহরের আকাশে ভেসে থাকা আতঙ্কের শব্দ নয়; সেটি আসলে বিশ্বরাজনীতির ভাঙা স্নায়ুর শব্দ, দূর সমুদ্রপথে আটকে পড়া জাহাজের শব্দ, তেলের ট্যাংকারের ভিতরে জমে থাকা উদ্বেগের শব্দ, আর দিল্লি, তেল আভিভ, তেহরান, ওয়াশিংটন ও দোহাকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখা ইতিহাসের শব্দ। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যে সংঘাত ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে শুরু হয়েছে বলে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছিল, তা আজ কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি বহু দশকের অসমাপ্ত বৈরিতা, নিরাপত্তা-দর্শন, সাম্রাজ্যবাদী উত্তরাধিকার, জ্বালানি-নির্ভরতা এবং পরমাণু-রাজনীতির বিস্ফোরিত সমীকরণ।
এই যুদ্ধকে যদি কেবল “ইজরায়েল বনাম ইরান” বা “আমেরিকা বনাম ইরান” বলে পড়া হয়, তবে বিষয়টির অর্ধেকও বোঝা যাবে না। কারণ এর ভিতরে রয়েছে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য-নীতির দীর্ঘ বিবর্তন, ইজরায়েলের সঙ্গে তার তথাকথিত “স্পেশাল রিলেশনশিপ”-এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত ইতিহাস, ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান থেকে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব হয়ে বর্তমান পর্যন্ত আমেরিকা-ইরান অবিশ্বাসের ধারা, এবং সেই সঙ্গে ভারত কীভাবে এই অগ্নিবলয়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেও এর ভেতরে জড়িয়ে আছে—জ্বালানি, প্রবাসী, কূটনীতি ও কৌশলগত ভারসাম্যের মাধ্যমে।
আগুনের শুরু, কিন্তু আগুনের জন্ম অনেক আগে
আজকের যুদ্ধের প্রত্যক্ষ পটভূমি খুব সাম্প্রতিক। ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যার সঙ্গে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার বিষয়টিও জড়িত, যদিও এর কাঠামো নিয়ে অস্পষ্টতা এবং আঞ্চলিক ফ্রন্টগুলিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। আল জাজিরাও ৮ এপ্রিল জানায়, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ সাময়িকভাবে বন্ধ করবে, আর তেহরান হরমুজ প্রণালী “সম্পূর্ণ, অবিলম্বে ও নিরাপদ”ভাবে খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে। অর্থাৎ, যুদ্ধ থামেনি; বরং সে সাময়িকভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
কিন্তু এই মুহূর্তের যুদ্ধকে বোঝার জন্য আরও পেছনে যেতে হয়। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর টাইমলাইন অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, কারণ তিনি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করেছিলেন। সেই অভ্যুত্থানের ফলে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর পশ্চিমাপন্থী রাজতন্ত্র আবার শক্তিশালী হয়, এবং ইরানের এক বড় অংশের কাছে আমেরিকা কেবল এক বিদেশি শক্তি নয়, দেশীয় রাজনৈতিক ভাগ্যনির্ধারক শক্তি হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে যায়।
তারপর শুরু হয় আর এক অধ্যায়। ১৯৫৭ সালে “অ্যাটমস ফর পিস” কর্মসূচির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক ব্যবহারের চুক্তি সই করে, যা পরবর্তী ইরানি পারমাণবিক কর্মসূচির ভিত্তি গড়ে দেয়। অর্থাৎ, ইতিহাসের এক তীব্র ব্যঙ্গ এখানেই: যে পারমাণবিক প্রশ্নকে সামনে রেখে আজ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও অবরোধের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, তার প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরিতেই একসময় আমেরিকা ছিল সক্রিয় অংশীদার।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব সেই সম্পর্কের ভিত উল্টে দেয়। শাহ পতন হন, আয়াতোল্লাহ খোমেনি ক্ষমতায় আসেন, ইরান একটি পশ্চিমাপন্থী রাজতন্ত্র থেকে পরিণত হয় আমেরিকা-বিরোধী ইসলামী প্রজাতন্ত্রে, এবং একই বছরে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল ও ৪৪৪ দিনের জিম্মি-সংকট দুই দেশের সম্পর্ককে গভীর শত্রুতার মধ্যে ঠেলে দেয়। সেই মুহূর্ত থেকে আমেরিকার চোখে ইরান কেবল একটি কঠিন রাষ্ট্র নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতাবস্থার প্রতিপক্ষ; আর ইরানের চোখে আমেরিকা কেবল একটি পরাশক্তি নয়, বরং তার সার্বভৌমত্ব-বিরোধী ঐতিহাসিক শক্তি।
এই সমীকরণকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তোলে ইরান-ইজরায়েল সম্পর্কের রূপান্তর। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পরিষ্কার, ১৯৭৯-এর আগে ইম্পেরিয়াল ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে গোপন কৌশলগত যোগাযোগ ছিল, কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী ইসলামি শাসন ইজরায়েলকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং ধীরে ধীরে হিজবুল্লাহ, হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি রাজনৈতিক, আর্থিক বা সামরিক সমর্থনের মাধ্যমে এক “প্রক্সি” সংঘর্ষের কাঠামো গড়ে তোলে। ফলে আজকের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রযুদ্ধ হঠাৎ জন্মায়নি; এটি বহু বছরের ছায়াযুদ্ধের প্রকাশ্য রূপ।
আমেরিকা ও ইজরায়েল: কেবল জোট নয়, একটি রাজনৈতিক অভ্যাস
ইজরায়েলের জন্মের পরপরই ১৯৪৮ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান দেশটিকে স্বীকৃতি দেন, এবং পরে ধাপে ধাপে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাকে মার্কিন বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারক মহল “স্পেশাল রিলেশনশিপ” নামে চিহ্নিত করতে শুরু করে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার বিশ্লেষণ দেখায়, এই সম্পর্কের শিকড় ১৯৪৮-এর আগেও ছিল—জায়নবাদ, খ্রিস্টীয় জায়নবাদ, হলোকাস্ট-পরবর্তী সহানুভূতি, এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা স্তর সেই সমর্থনকে দৃঢ় করে।
তবে এ-ও সত্য, সম্পর্কটি সবসময় একরকম ছিল না। একই বিশ্লেষণে দেখা যায়, ট্রুম্যান ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও ১৯৪৮-এর আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে উভয় পক্ষকেই অস্ত্র দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন; আইজেনহাওয়ার ১৯৫৭ সালে ইজরায়েলকে সিনাই থেকে সরে আসতে চাপও দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর আমেরিকার চোখে ইজরায়েলের কৌশলগত মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়, এবং লিন্ডন জনসনের আমলে আক্রমণাত্মক অস্ত্র-সহায়তা, পরে নিক্সনের সময় আরও বৃহৎ সামরিক ও আর্থিক সহায়তা, এই সম্পর্ককে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির অন্যতম স্তম্ভে পরিণত করে।
সেখান থেকেই আজকের বাস্তবতা: ইজরায়েল যখন ইরানকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরে, তখন আমেরিকার একাংশ সেটিকে নিজের নিরাপত্তা ভাষার মধ্যেও অনুবাদ করে। আর আমেরিকা যখন ইরানের পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তোলে, ইজরায়েল সেটিকে বেঁচে থাকার প্রশ্নে পরিণত করে। এই দুই ভাষা—কৌশলগত ভাষা ও অস্তিত্বগত ভাষা—যখন মিলে যায়, তখন কূটনীতি দ্রুত যুদ্ধের দিকে সরে যায়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর সাম্প্রতিক নথি মনে করিয়ে দেয়, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি বা জেসিপিওএ ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমা, কঠোর নজরদারি এবং নিষেধাজ্ঞা-শিথিলতার এক পারস্পরিক কাঠামো তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে “ম্যাক্সিমাম প্রেসার” নীতি গ্রহণ করে, এবং তার পর থেকে ইরান ধাপে ধাপে চুক্তির সীমা লঙ্ঘন করে সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়, যা অবিশ্বাসের চক্রকে আরও দ্রুত ঘুরিয়ে দেয়। অর্থাৎ, আজকের বিস্ফোরণ কেবল ২০২৬ সালের ঘটনা নয়; এটি ২০১৫-এর একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক জানালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিণতিও।
ইরানের চোখে যুদ্ধ: নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, প্রতিশোধ
পশ্চিমা সংবাদবর্ণনায় ইরানকে প্রায়শই শুধু “রিজিম”, “প্রক্সি-স্পনসর” বা “পারমাণবিক ঝুঁকি” হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু এই চিত্র পূর্ণ নয়। ১৯৫৩-এর অভ্যুত্থান, ১৯৮০-৮৮ ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকের প্রতি মার্কিন সমর্থন, ১৯৮৮-তে হরমুজ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান, ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানিকে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যা—এই ধারাবাহিকতায় ইরান তার নিরাপত্তা-দর্শন গড়ে তুলেছে, যেখানে প্রতিরোধ, প্রতিশোধ এবং প্রতিরোধ-ক্ষমতার প্রদর্শন রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। ইরানের কাছে তার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক, এমনকি হরমুজে চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতাও একপ্রকার প্রতিরোধমূলক বীমা।
এই কারণেই বর্তমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইরান “সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ”-এর ভাষায় কথা বলছে না। বরং তেহরান এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে চাইছে, যেখানে যুদ্ধ সাময়িক বিরতি পেলেও সে আঞ্চলিক সমীকরণে নিজের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া ঠেকাতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি যতই হোক, রাষ্ট্রগুলি কেবল প্রাণহানির হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; তারা দেখে ভবিষ্যৎ ভয়-সাম্য কতখানি রইল।
ভারত: দূরের যুদ্ধ, কিন্তু ঘরের ভেতরের অভিঘাত
ভারত এই সংঘাতে দর্শক নয়, যদিও সে যোদ্ধাও নয়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক মার্চের শুরুতেই জানায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর সময় থেকেই নয়াদিল্লি সব পক্ষকে সংযম, উত্তেজনা-হ্রাস এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভারত স্পষ্ট করে দেয় যে এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তা তার কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
এই উদ্বেগ কেবল মানবিক নয়, অর্থনৈতিকও। ভারতীয় সংবাদসূত্রগুলির উদ্ধৃতিতে স্পষ্ট, প্রায় এক কোটির মতো ভারতীয় নাগরিক পশ্চিম এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বাস ও কাজ করেন, এবং সেই অঞ্চল থেকে ভারতের কাছে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, এই যুদ্ধ প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় রেমিট্যান্স ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অর্থাৎ, তেহরানের আকাশে যে আগুন, তার ছাই কেরল, তামিলনাড়ু, তেলঙ্গানা, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, এমনকি বাংলার ঘরেও এসে পড়তে পারে।
এর সঙ্গে আছে জ্বালানির প্রশ্ন। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-চোকপয়েন্ট, এবং যুদ্ধবিরতির শর্তেও সেটি “সম্পূর্ণ ও নিরাপদ”ভাবে খুলে দেওয়ার প্রশ্ন এত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলেই বোঝা যায়, বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশেষ করে এশীয় আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এর গুরুত্ব কতখানি। ভারতীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ভারতের তেল ও গ্যাস সরবরাহ, বীমা খরচ, শিপিং রুট, মুদ্রাস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন এবং ভোক্তা ব্যয়ের উপর সরাসরি আঘাত হানতে পারে।
কূটনৈতিক দিক থেকেও ভারতের অবস্থা সহজ নয়। একদিকে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হয়েছে, অন্যদিকে ইজরায়েল ভারতের প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা-সহযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার; আবার ইরান ভারতের জ্বালানি, চাবাহার বন্দর এবং মধ্য এশিয়া-সংযোগের দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। ফলে দিল্লির সামনে এখনকার প্রশ্ন কেবল “কাকে সমর্থন” করা নয়; বরং “কীভাবে কাউকে সম্পূর্ণ হারানো ছাড়া নিজের স্বার্থ বাঁচানো যায়।”
ভারতের দীর্ঘ ইতিহাস: পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আজকের নয়
ভারত ও পশ্চিম এশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাস স্বাধীন ভারতের চেয়েও বহু পুরনো। ঐতিহাসিক আলোচনা অনুযায়ী, ভারত ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে প্রাচীন বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল, যেখানে আরব সাগর পেরিয়ে বস্ত্র, মসলা, খেজুর, ঘোড়া ও অন্যান্য পণ্য আদানপ্রদান হত। ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ ভারত মধ্যপ্রাচ্যকে প্রায়শই ভারতের “ফরোয়ার্ড ডিফেন্স” অঞ্চল হিসেবে দেখত; পারস্য উপসাগর, মেসোপটেমিয়া ও আশপাশের ভূখণ্ডকে ভারতীয় উপমহাদেশের নিরাপত্তার বিস্তৃত অর্ধবৃত্ত বলে ধরে সাম্রাজ্য কৌশল নির্মিত হত।
স্বাধীনতার পরে জওহরলাল নেহরুর পররাষ্ট্রনীতি এই অঞ্চলকে আর এক ভাষায় পড়ে—উপনিবেশবিরোধিতা, আরব বিশ্বের প্রতি সহানুভূতি, অ-জোটনীতি, এবং ইজরায়েল সম্পর্কে দীর্ঘ সতর্ক দূরত্বের মধ্যে দিয়ে। পরবর্তী দশকগুলিতে ভারত ধীরে ধীরে আরব বিশ্ব, ইরান ও ইজরায়েল—তিনটির সঙ্গেই সম্পর্ক রক্ষা করার একটি বাস্তববাদী নীতি গড়ে তোলে, যা একবিংশ শতকে এসে “মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট” নামে বেশি পরিচিত।
এই কারণেই আজকের যুদ্ধ ভারতের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আর একটি অধ্যায় নয়; এটি ভারতের বহুদিনের পশ্চিম এশিয়া নীতির পরীক্ষার মুহূর্ত। দিল্লি যদি খুব বেশি মার্কিন বা ইজরায়েল-পন্থী দেখায়, তবে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে; আবার যদি প্রকাশ্য ইরান-সমর্থনে যায়, তবে ওয়াশিংটন ও তেল আভিভের সঙ্গে কৌশলগত সমীকরণ অস্বস্তিতে পড়তে পারে।
তাহলে ভবিষ্যৎ কোথায়?
এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি সম্ভাবনা আপাতত সবচেয়ে বাস্তব। প্রথমত, একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত হতে পারে, যেখানে সরাসরি মার্কিন-ইরান সংঘর্ষ কিছুটা কমবে, কিন্তু ইজরায়েল-হিজবুল্লাহ বা অন্য প্রক্সি ফ্রন্টে উত্তেজনা বজায় থাকবে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে খানিকটা স্বস্তি ফিরলেও মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অস্থিরতা অটুট থাকবে।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিরতির ক্ষুদ্র কোনো লঙ্ঘন, ভুল বার্তা, বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক উসকানি আবার বৃহত্তর হামলার দরজা খুলে দিতে পারে। আমেরিকা যদি ইরানের পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার ভাষায় ফিরে যায়, অথবা ইরান যদি হরমুজ ও আঞ্চলিক প্রক্সির মাধ্যমে চাপ বাড়ায়, তবে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তৃতীয়ত, তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাবনাময় হলেও, একটি নতুন কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি হতে পারে—যেখানে ইরানের সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা, নজরদারি ব্যবস্থা, আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক, নিষেধাজ্ঞা-শিথিলতা এবং নিরাপত্তা-আশ্বাসকে একটি নতুন প্যাকেজে বাঁধার চেষ্টা হবে। কিন্তু ২০১৫ সালের চুক্তির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কাগজে স্বাক্ষর করলেই ইতিহাসের ক্ষত সেরে যায় না; পারস্পরিক অবিশ্বাসের ভাঁজ অনেক গভীর।
ভারতের জন্য এই তিন ভবিষ্যতের প্রতিটিই ভিন্ন সংকেত বহন করে। ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি মানে হবে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি, সমুদ্রপথ সুরক্ষায় বেশি মনোযোগ এবং উপসাগরীয় প্রবাসীদের নিরাপত্তায় ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা। আর বড় আকারের পুনঃসংঘাত মানে হবে মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্সের ধাক্কা, বীমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, এবং ভারতের বহুমুখী কূটনীতির উপর চাপ।
উপসংহার: এই যুদ্ধ দূরের নয়
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে আমরা প্রায়ই টেলিভিশনের পর্দায় দেখি—মিসাইল, মানচিত্র, জ্বলন্ত শিরোনাম, এক নেতার বক্তব্য, আরেক নেতার পাল্টা হুমকি। কিন্তু যুদ্ধের আসল রূপ অনেক বেশি জটিল। এটি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং ইতিহাসের অসমাপ্ত প্রশ্নগুলির নতুন বিস্ফোরণ। ১৯৫৩ সালের তেহরান, ১৯৪৮ সালের প্যালেস্টাইন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লব, ২০১৫ সালের পরমাণু-চুক্তি, ২০১৮ সালের মার্কিন প্রত্যাহার—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এই আগুনের ভিত তৈরি হয়েছে।
এবং এখানেই ভারতীয় পাঠকের জন্য সবচেয়ে জরুরি উপলব্ধি। পশ্চিম এশিয়া ভারতের জন্য কোনো “দূরবর্তী অঞ্চল” নয়; সেটি আমাদের তেলের পথ, প্রবাসী শ্রমের ভরসা, কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা, এবং বৃহত্তর এশীয় শক্তি হিসেবে ভারতের আত্মপরিচয়েরও অংশ। তাই তেহরানে বোমা পড়লে, তার প্রতিধ্বনি শুধু তেহরানেরই থাকে না; তা মুম্বইয়ের জ্বালানির দামে, কেরলের বাড়িতে পাঠানো টাকায়, দিল্লির নীতিনির্ধারণে, আর গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ-কল্পনায় গিয়ে লাগে।
হরমুজের জলে আজ যে টান, সেটি আসলে কেবল জাহাজ থামিয়ে দেওয়ার টান নয়; সেটি বিশ্বরাজনীতির শিরায় আঙুল রেখে বলে দেওয়া, শক্তির মানচিত্র এখনও লেখা শেষ হয়নি। আর সেই কারণেই এই যুদ্ধের কাহিনি লিখতে গেলে শুধু কারা কাকে আঘাত করল, কত মিসাইল ছোঁড়া হল, বা কত দিনের যুদ্ধবিরতি হল—এতেই থামা যায় না। লিখতে হয় কেমন করে একটি অঞ্চল বারবার পৃথিবীর ইতিহাসকে নিজের আগুনে টেনে নেয়, কেমন করে পরাশক্তির কৌশল ছোট রাষ্ট্রগুলির জীবনকে বদলে দেয়, এবং কেমন করে ভারত, নিজের সমস্ত সাবধানতা সত্ত্বেও, সেই আগুনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা আজ কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কিন্তু এতটুকু বলা যায়—যদি কূটনীতি ব্যর্থ হয়, তবে পরবর্তী বিস্ফোরণ শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বিশ্ববাজার, আন্তর্জাতিক আইন, জ্বালানি-নিরাপত্তা, এবং এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য—সবকিছুকেই নতুন করে লিখবে। আর যদি কূটনীতি অল্প হলেও জায়গা করে নেয়, তবে সেটি হবে ইতিহাসের বিরুদ্ধে নয়, ইতিহাসকে বুঝে তার ক্ষত বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা।
