ভারত আজ মহাকাশে যায়, ডিজিটাল অর্থনীতির ভাষায় কথা বলে, বিশ্বমঞ্চে নিজের শক্তির পরিচয় দিতে চায়; তবু দেশের ভেতরে এক পুরোনো প্রশ্ন এখনও জেগে থাকে—এই অগ্রগতি কার জন্য, এই গণতন্ত্র কাদের জন্য, এই ন্যায়বিচার কতজনের নাগালে। আদালতে মামলা জমে থাকে বছরের পর বছর, জাতপাতের দাগ এখনও মানুষের ভবিতব্য নির্ধারণ করে, শিক্ষিত তরুণও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে, আর জনজীবনে অনেক সময় যুক্তির চেয়ে শোরগোল বেশি মূল্য পায়। এমন এক সময়ে ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ফিরে আসেন কেবল ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নয়, বর্তমানের অন্তঃসারশূন্যতা মাপার এক নির্মম মানদণ্ড হয়ে।
আমরা তাঁকে সংবিধানের প্রধান নির্মাতাদের একজন হিসেবে জানি, দলিতদের মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক হিসেবে জানি, কিন্তু ২১শ শতকে তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। তিনি শুধু বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিশ্বমানের শিক্ষায় গড়ে ওঠা এক অর্থনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, রাষ্ট্রচিন্তক, শ্রম-সংস্কারক এবং গভীর মানবতাবোধসম্পন্ন এক বুদ্ধিজীবী, যিনি বুঝেছিলেন—যে সমাজ মানুষকে সম্মান দিতে শেখেনি, সে সমাজ সভ্যতার দাবি করতে পারে না।
এই কারণেই আম্বেদকরকে স্মরণ করা মানে শুধু জন্মজয়ন্তীতে মাল্যদান নয়। তাঁকে সত্যিই স্মরণ করা মানে ভারতের গণতন্ত্র, আইন, প্রশাসন, শিক্ষা, সমাজনীতি ও নৈতিকতাকে তাঁর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো। আজকের ভারত যদি জানতে চায় কেন ন্যায়বিচার দেরি করে আসে, কেন সমতা কাগজে বেশি আর জীবনে কম, কেন যুবসমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি, কেন উন্নয়ন সত্ত্বেও মর্যাদাহানি শেষ হয় না—তাহলে আম্বেদকরকে নতুন করে পড়তেই হবে।
আম্বেদকরের প্রাসঙ্গিকতা বোঝার প্রথম শর্ত হলো তাঁর জীবনকে কেবল জীবনী হিসেবে না পড়ে, ভারতীয় সমাজের নির্মম আয়না হিসেবে পড়া। ১৮৯১ সালে মহুতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বড় হয়েছেন, যেখানে জন্মই ছিল পরিচয়ের কারাগার। স্কুলে আলাদা বসতে বাধ্য হওয়া, পানীয় জলের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, সামাজিক আচরণে অপমানিত হওয়া—এই সব অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে বইয়ের তত্ত্ব ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার দৈনন্দিন ক্ষত। কিন্তু এখানেই তাঁর মহত্ত্ব—তিনি অপমানকে আত্মবিনাশে নয়, আত্মগঠনে পরিণত করেছিলেন।
একজন ছাত্রের দৃষ্টিতে দেখলে, আম্বেদকরের জীবন এক ধরনের বিপরীত মহাকাব্য। কোনো বংশগৌরব নয়, কোনো আরামদায়ক উত্তরাধিকার নয়, কোনো সামাজিক আশ্রয় নয়—বরং অবজ্ঞা, বঞ্চনা, সংগ্রাম, আর তার ভেতর দিয়েই জ্ঞান, যুক্তি ও আত্মমর্যাদার উত্থান। ভারতীয় সাহিত্য বহুদিন ধরে প্রান্তিকের বেদনা লিখেছে, কিন্তু আম্বেদকর সেই বেদনাকে রাজনৈতিক দর্শনে, আইনগত কাঠামোয় এবং সামাজিক পরিবর্তনের রূপরেখায় রূপ দিয়েছেন। এই জন্যই তিনি কেবল ইতিহাসের চরিত্র নন; তিনি এক জীবন্ত ভাষা, যার ভেতর দিয়ে নিপীড়িত মানুষ নিজেদের পুনরায় উচ্চারণ করতে শেখে।
আম্বেদকরের জীবনের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো শিক্ষার প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা। তিনি এলফিনস্টোন কলেজে পড়াশোনা করেন, পরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নেন, লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সে অর্থনীতিতে গবেষণা করেন, পাশাপাশি গ্রেজ ইন-এ আইনচর্চার প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন। তাঁর একাডেমিক যাত্রা শুধু ডিগ্রি অর্জনের ইতিহাস নয়; এটি দেখায় কীভাবে শিক্ষা সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার অস্ত্র হতে পারে। আজকের ভারতের তরুণদের কাছে এই শিক্ষা আরও জরুরি, কারণ বর্তমান সময়ে শিক্ষাকে প্রায়ই চাকরি পাওয়ার টিকিটে সীমাবদ্ধ করা হয়, অথচ আম্বেদকর শিক্ষা থেকে খুঁজেছিলেন চিন্তার স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক রূপান্তরের শক্তি।
তাঁর বিখ্যাত আহ্বান—“Educate, Agitate, Organise”—আসলে একটি গণতান্ত্রিক জীবনদর্শনের সংক্ষিপ্ত সূত্র। “শিক্ষিত হও” মানে শুধু পাশ করা নয়; মানে নিজের অবস্থান বুঝতে শেখা, সমাজের শোষণ-যন্ত্র বুঝতে শেখা, এবং জ্ঞানের সাহায্যে নিজেকে ও সমাজকে নতুনভাবে নির্মাণ করা। “আন্দোলিত হও” মানে অন্ধ হিংসা নয়; মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন, সংগঠিত, যুক্তিনিষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আর “সংগঠিত হও” মানে ক্ষণিক আবেগ নয়; মানে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক শক্তি তৈরি করা, যাতে পরিবর্তন ব্যক্তি-নির্ভর না থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
২১শ শতকের যুবসমাজের জন্য এই বাণী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের তরুণ প্রজন্ম এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে বাস করে—একদিকে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণ, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট; একদিকে আত্মপ্রকাশের সুযোগ, অন্যদিকে সামাজিক বিদ্বেষের ডিজিটাল বিস্তার; একদিকে উচ্চশিক্ষার প্রসার, অন্যদিকে গভীর মানসিক অনিশ্চয়তা। আম্বেদকর তাঁদের শেখান, ক্ষোভকে চিন্তায় পরিণত করতে, হতাশাকে প্রস্তুতিতে বদলাতে, আর ব্যক্তিগত উন্নতিকে সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করতে।
এখানেই তাঁর ধৈর্যের পাঠটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আম্বেদকরের জীবন দেখায়, ধৈর্য মানে অন্যায়ের কাছে নত হওয়া নয়; ধৈর্য মানে দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। তিনি রাত জেগে পড়েছেন, গবেষণা করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আবেগ নয়, যুক্তি দিয়ে লড়েছেন, আইনের ভাষাকে শাণিত করেছেন, এবং একের পর এক অপমানের মাঝেও আত্মবিনাশী ক্রোধে ভেসে যাননি। আজ যখন সমাজে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা আর অপরিণত মতামত প্রায় নিত্যস্বাভাবিক, তখন আম্বেদকর শেখান—স্থায়ী পরিবর্তন আসে প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা ও চিন্তার গভীরতা থেকে।
আম্বেদকরের আরেকটি বিশাল অবদান হলো, তিনি বুঝেছিলেন কেবল রাজনৈতিক গণতন্ত্র যথেষ্ট নয়। ভোটাধিকার থাকলেই গণতন্ত্র পূর্ণ হয় না, যদি সমাজের ভিতরে জাতপাত, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অবমাননা এবং সাংস্কৃতিক বর্জন অটুট থাকে। তাঁর ভাষায়, গণতন্ত্র শুধু সরকার গঠনের একটি পদ্ধতি নয়; এটি “associated living” বা সহাবস্থানের এমন এক নৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষ পরস্পরকে মর্যাদা দেয়, শ্রদ্ধা দেয়, সমান মানবিক সত্তা হিসেবে স্বীকার করে। আজকের মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে এই কথার গুরুত্ব অপরিসীম।
সমসাময়িক ভারতে গণতন্ত্রের বাহ্যিক আয়োজন যতই শক্তিশালী হোক, সামাজিক গণতন্ত্রের সংকট বারবার সামনে আসে। বিদ্বেষমূলক ভাষণ, গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ, সামাজিক মাধ্যমে অমানবিক ট্রল-সংস্কৃতি, পরিচয়ের ভিত্তিতে অবিশ্বাস—এই সবই দেখায়, আমরা ভোট দিতে শিখেছি, কিন্তু সহনাগরিককে মর্যাদা দিতে এখনও সম্পূর্ণ শিখিনি। আম্বেদকর এখানে আমাদের কেবল রাজনৈতিক শিক্ষা দেন না; তিনি নৈতিক শিক্ষা দেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, স্বাধীনতা ও সমতা কাগজে লেখা যেতে পারে, কিন্তু ভ্রাতৃত্ব না থাকলে সেগুলি সমাজে রক্তসঞ্চালন পায় না।
এই জায়গায় তাঁর “জাতপ্রথা বিনাশ”-এর তত্ত্বকে নতুন করে দেখা দরকার। আম্বেদকর জাতকে কখনও নিছক সামাজিক কুসংস্কার হিসেবে দেখেননি; তিনি দেখেছেন ক্ষমতার একটি সুসংগঠিত রূপ হিসেবে, যা মানুষের শ্রম, শরীর, স্বপ্ন, বিবাহ, বাসস্থান, শিক্ষা ও আত্মসম্মান—সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। ২১শ শতকের ভারত নিজেকে আধুনিক বলে ঘোষণা করলেও, বাস্তবে জাত এখনও কর্মক্ষেত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রাম-শহর সম্পর্ক, সহিংসতা, এমনকি প্রেম ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও গভীরভাবে কার্যকর। তাই আম্বেদকরের প্রাসঙ্গিকতা কমেনি; বরং সমাজ যত বেশি আধুনিকতার ভাষা ব্যবহার করেছে, তাঁর প্রশ্ন তত বেশি তীক্ষ্ণ হয়েছে।
আম্বেদকরকে বোঝার জন্য সংবিধানের প্রসঙ্গ অনিবার্য। ভারতের সংবিধান প্রণয়নের খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শুধু আইনি ধারাগুলি সাজাননি; তিনি একটি ক্ষতবিক্ষত সমাজকে ন্যায়, স্বাধীনতা, সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। অস্পৃশ্যতা বিলোপে অনুচ্ছেদ ১৭, বৈষম্যবিরোধী সাংবিধানিক সুরক্ষা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও সংরক্ষণের ধারণা—এসবের মধ্যে ছিল তাঁর সামাজিক ন্যায়ের সুদূরপ্রসারী দর্শন। সংবিধান তাঁর কাছে কেবল প্রশাসনিক দলিল ছিল না; ছিল নিপীড়িত মানুষের জন্য মর্যাদার এক আইনি আশ্রয়।
এই কারণেই আইন ও বিচারব্যবস্থার আলোচনায় আম্বেদকর এখনও কেন্দ্রীয়। তিনি বুঝেছিলেন, অধিকার তখনই বাস্তব, যখন তার প্রতিকার বাস্তব। অনুচ্ছেদ ৩২-কে তিনি সংবিধানের “heart and soul” বা হৃদয় ও আত্মা বলেছিলেন, কারণ এর মাধ্যমে নাগরিক সরাসরি সাংবিধানিক প্রতিকার চাইতে পারে। অর্থাৎ, আইনের মর্যাদা কেবল গ্রন্থে নয়, নাগরিকের হাতে পৌঁছনোর ক্ষমতায়। এখানেই আজকের ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যথাগুলোর একটি এসে পড়ে—বিচার পেতে দেরি।
“Justice delayed is justice denied”—বাক্যটি খুব পরিচিত, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটি আম্বেদকরের উক্তি নয়; এর উৎস মূলত ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও আইনি পরম্পরায়, বিশেষত উইলিয়াম ইওয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোনের সঙ্গে এটি যুক্ত করে দেখা হয়। কিন্তু বাক্যটি আম্বেদকরের রাষ্ট্রদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ বিচার যদি এতটাই দেরিতে আসে যে নির্যাতিতের জীবন, মর্যাদা, স্বাধীনতা বা অধিকারই ততদিনে ক্ষয়ে যায়, তবে সেই বিচার আর সত্যিকারের ন্যায় থাকে না। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ন্যায়েরও প্রশ্ন।
ভারতে বিচারবিলম্ব সবচেয়ে বেশি আঘাত করে গরিব মানুষকে, দলিত-আদিবাসী সম্প্রদায়কে, শ্রমজীবী মানুষকে, নারীদের, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে এবং আন্ডারট্রায়াল বন্দিদের। ধনী ব্যক্তি মামলা চালিয়ে যেতে পারেন, অপেক্ষা করতে পারেন, ব্যয় বহন করতে পারেন; কিন্তু দুর্বল মানুষের কাছে সময় নিজেই শাস্তি হয়ে ওঠে। বহু মানুষ আদালতের রায় পাওয়ার আগেই আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েন, সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, কিংবা স্বাধীনতা হারান। আম্বেদকরের আলোয় বিচারব্যবস্থাকে দেখলে প্রশ্ন উঠবে—আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি বিলম্ব ও ব্যয়ের কারণে ন্যায়বিচারও শ্রেণি ও সামাজিক অবস্থানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে। কারণ আম্বেদকর সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকারে নয়, সাংবিধানিক নৈতিকতায় রাষ্ট্রকে বিচার করতে শিখিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন, অন্ধ নায়কপূজা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন গণতন্ত্রকে খোলসে রেখে তার প্রাণশক্তি কেড়ে নিতে পারে। আজকের যে কোনো সরকারকে তাঁর দৃষ্টিতে নিজেকে যাচাই করতে হবে—সংবিধান কি কেবল শপথের ভাষা, নাকি নীতিনির্ধারণের নৈতিক মেরুদণ্ড।
আম্বেদকরের গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়; অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তিনি বিস্ময়করভাবে আধুনিক। “The Problem of the Rupee” গ্রন্থে তিনি ঔপনিবেশিক মুদ্রাব্যবস্থার অসঙ্গতি বিশ্লেষণ করেন এবং দেখান, মুদ্রানীতি কেবল আর্থিক কারিগরি বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়ে শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের জীবনে। তিনি রুপির ক্রয়ক্ষমতার স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, কারণ মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আঘাত করে যাদের হাতে সঞ্চয় কম, আয় সীমিত, এবং বাজারের ওঠানামা সামলানোর ক্ষমতা নেই। আজ যখন মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, এবং অর্থনৈতিক নীতির সামাজিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক হয়, তখন আম্বেদকরের অর্থনৈতিক চিন্তা আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
তাঁর শ্রমনীতি আরও বেশি স্পষ্টভাবে মানবিক রাষ্ট্রের ধারণাকে সামনে আনে। ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে শ্রম বিভাগের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি কাজের সময়সীমা কমানো, আট ঘণ্টার কর্মদিবস, সাপ্তাহিক শ্রমের সীমা, ছুটির অধিকার, শ্রমিকের সুরক্ষা এবং বিভিন্ন কল্যাণমূলক ব্যবস্থার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। শ্রমকে তিনি কেবল উৎপাদনের উপাদান হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন মানুষের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে। বর্তমান গিগ অর্থনীতি, চুক্তিভিত্তিক কাজ, অনিশ্চিত চাকরি, ডেলিভারি-অ্যাপ নির্ভর শ্রমব্যবস্থা—এসবের প্রেক্ষিতে আম্বেদকরের শ্রমদর্শন নতুন করে পাঠ দাবি করে।
একজন বাঙালি সাহিত্যপাঠকের কাছে এখানে একটি গভীর মানবিক সূত্র ধরা পড়ে। আম্বেদকর রাষ্ট্র নির্মাণ করেছেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি সব সময় মানুষকেন্দ্রিক। তিনি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে কখনও মানুষহীন যন্ত্রে পরিণত হতে দেননি। আইন, অর্থনীতি, সংবিধান, শ্রমনীতি—সবকিছুর কেন্দ্রে তিনি খুঁজেছেন মানুষকে; বিশেষত সেই মানুষকে, যে সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এই মানবিকতা থেকেই তাঁর সহমর্মিতার শিক্ষা আসে।
সহমর্মিতা, আম্বেদকরের কাছে, দুর্বল আবেগ নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক নৈতিকতা। তিনি দয়া চাননি, মর্যাদা চেয়েছেন। তিনি করুণা নয়, অধিকার চেয়েছেন। তিনি ভিক্ষিত উন্নয়ন নয়, কাঠামোগত ন্যায় চেয়েছেন। এই জন্যই তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—মানবিক হওয়া মানে কেবল কোমল হওয়া নয়; মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় হওয়া, নীরবের কণ্ঠস্বর শোনা, এবং সমগ্র সমাজকে এমনভাবে ভাবা যাতে সবচেয়ে পেছনের মানুষটিও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে।
তাঁর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্তও এই বৃহত্তর নৈতিক যাত্রার অংশ। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি অনুভব করেছিলেন, যে ধর্মীয়-সামাজিক কাঠামো মানুষের জন্মগত অসম্মানকে টিকিয়ে রাখে, তার মধ্যে থেকে প্রকৃত মুক্তি পাওয়া কঠিন। ১৯৫৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে ব্যাপক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ ছিল কেবল ধর্মান্তর নয়; ছিল ন্যায়, সমতা, যুক্তি ও আত্মমর্যাদার পক্ষে এক সাংস্কৃতিক পুনর্জন্মের ঘোষণা। এখানেও আমরা দেখি, আম্বেদকর ব্যক্তিজীবন, নৈতিকতা ও সমাজ পরিবর্তনকে আলাদা compartments-এ রাখেননি; তিনি মানুষকে সামগ্রিক সত্তা হিসেবে ভেবেছেন।
এই সামগ্রিকতাই তাঁকে ২১শ শতকে এত জরুরি করে তুলেছে। কারণ আজকের ভারত শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত সাফল্যের প্রশ্নের মুখোমুখি নয়; এটি ন্যায্যতা, নাগরিক মর্যাদা, সামাজিক বিশ্বাস, এবং রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্রের প্রশ্নের মুখোমুখিও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে থাকা যুবক-যুবতী, আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়ানো সাধারণ মানুষ, কাজের অনিশ্চয়তায় ভোগা শ্রমজীবী, পরিচয়ের কারণে অপমানিত নাগরিক—সবাই কোনো না কোনোভাবে আম্বেদকরের প্রশ্নের মধ্যে এসে দাঁড়ায়।
সাংবাদিকের দৃষ্টিতে এই প্রাসঙ্গিকতা আরও মূল্যবান। কারণ আম্বেদকরকে নিয়ে ভালো লেখা মানে তাঁকে নিয়ে ভক্তিগীতি লেখা নয়; বরং বর্তমান ভারতকে তাঁর আলোয় পরীক্ষার টেবিলে তোলা। কোনো জেলা আদালতে বিচারবিলম্ব, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যের অভিযোগ, কোনো শ্রমিক আন্দোলনের দাবি, কোনো প্রান্তিক সম্প্রদায়ের শিক্ষালাভের লড়াই, কোনো অর্থনৈতিক নীতির ফলে নিম্নবিত্তের উপর চাপ—এসব প্রতিটি খবরই আম্বেদকরীয় পাঠে নতুন মাত্রা পেতে পারে। এই অর্থে আম্বেদকর কেবল অতীতের বিষয় নন; তিনি বর্তমানের সংবাদমূল্য, নৈতিকতা ও বিশ্লেষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ড. বি. আর. আম্বেদকরকে ২১শ শতকের ভারতের জন্য প্রাসঙ্গিক বলা হয়তো যথেষ্ট নয়; বরং বলা উচিত, তাঁকে ছাড়া আধুনিক ভারতের অনেক সংকটকে সম্পূর্ণভাবে বোঝাই যায় না। তিনি আমাদের শেখান, রাষ্ট্রের শক্তি তার দমনক্ষমতায় নয়, ন্যায়ের সক্ষমতায়; শিক্ষার সার্থকতা ডিগ্রিতে নয়, মুক্তিতে; গণতন্ত্রের মর্যাদা ভোটে নয়, মানুষের পরস্পরকে মানুষ হিসেবে মেনে নেওয়ার মধ্যে।
সরকারের কাছে তিনি এক সতর্কবার্তা—সংবিধানকে অলঙ্কার বানিও না, তাকে নৈতিক দায়িত্বে রূপ দাও। যুবসমাজের কাছে তিনি এক আহ্বান—নিজেকে গড়ো, চিন্তা করো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, কিন্তু তা করো জ্ঞান, সংগঠন ও আত্মমর্যাদার শক্তিতে। সমাজের কাছে তিনি এক কঠিন আয়না—জাত, ঘৃণা, অবমাননা ও ভণ্ড সমতার মুখোশ খুলে ফেলো। আইনের কাছে তিনি এক অবিচল প্রশ্ন—অধিকার লিখে রাখাই কি যথেষ্ট, নাকি তার দ্রুত ও সমান প্রতিকার নিশ্চিত করাও কর্তব্য।
সবশেষে, আম্বেদকর আমাদের ধৈর্যের পাঠ দেন, কিন্তু নীরবতার নয়; সহমর্মিতার পাঠ দেন, কিন্তু দুর্বলতার নয়; উন্নতির পাঠ দেন, কিন্তু একক সাফল্যের নয়—সমষ্টিগত মানবমুক্তির। যে ভারত সত্যিই বড় হতে চায়, তাকে কেবল জিডিপি-তে নয়, নাগরিকের মর্যাদায় বড় হতে হবে। আর সেই ভারত নির্মাণের পথে আম্বেদকর আজও এক প্রদীপ, এক প্রশ্ন, এক বিবেক—এবং সম্ভবত, এক অনিবার্য ভবিষ্যৎ।
