নিজস্ব সংবাদদাতা | কলকাতা | ২ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের মালদহে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা সাতজন বিচারিক আধিকারিককে প্রায় নয় ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখার ঘটনায় বৃহস্পতিবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত এই ঘটনাকে বিচারব্যবস্থাকে ভয় দেখানো, নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত করা এবং শীর্ষ আদালতের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার “নগ্ন চেষ্টা” বলে মন্তব্য করেছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, এই ঘটনা কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, বরং “মবোক্রেসি” এবং সম্ভাব্য “ক্রিমিনাল কনটেম্পট”-এর প্রশ্নও তুলছে। শুনানিতে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, পশ্চিমবঙ্গের মতো এত রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত পরিস্থিতি আদালত খুব কমই দেখেছে।
মালদহে কী ঘটেছিল
বুধবার মালদহের কালিয়াচক-২ বিডিও অফিসে সাতজন বিচারিক আধিকারিককে এসআইআর-সংক্রান্ত আপত্তি ও দাবি খতিয়ে দেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এক ধরনের আধা-বিচারিক দায়িত্ব পালন করছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকার তথাকথিত অসঙ্গতি ও আপত্তিগুলির নিষ্পত্তি করা।
অভিযোগ, বিকেল সাড়ে ৩টা নাগাদ বিপুল সংখ্যক মানুষ বিডিও অফিস ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল, বহু বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং বিচারিক আধিকারিকদের অবিলম্বে সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সাতজন আধিকারিক কার্যত অফিসের ভিতরে আটকে পড়েন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সেখান থেকে বেরোতে পারেননি এবং অবশেষে মধ্যরাতের পর পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সহায়তায় তাঁদের বের করে আনা হয়।
অভিযান চলাকালীন তাঁদের গাড়ির উপর ইট-পাটকেল ও লাঠি নিয়ে হামলারও অভিযোগ উঠেছে। যদিও বিচারিক আধিকারিকদের গুরুতর শারীরিক আঘাতের খবর মেলেনি, ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির ছবি ও ভিডিও ঘটনাটির তীব্রতা স্পষ্ট করে।
কীভাবে নড়ে বসল শীর্ষ আদালত
মালদহের ঘটনার পর কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে। সেই চিঠিতে বলা হয়, জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সেই চিঠিকেই ভিত্তি করে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে। মামলার শিরোনাম ছিল, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত বিচারিক আধিকারিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত আনুষঙ্গিক বিষয়।
আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, বিচারিক আধিকারিকরা বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত “হোস্টেজ”-এর মতো অবস্থায় ছিলেন। এমনকি তাঁদের সরিয়ে আনার সময়ও গাড়ির উপর হামলা হওয়া আদালতের দৃষ্টিতে ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তোলে।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানায়, এই ঘেরাও ছিল “অত্যন্ত নিন্দনীয়” এবং চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া স্তব্ধ করার “পরিকল্পিত” প্রচেষ্টা। আদালতের মতে, এসআইআর-সংক্রান্ত আপত্তির শুনানি বানচাল করতে বিচারিক আধিকারিকদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
বেঞ্চ আরও জানায়, ওই বিচারিক আধিকারিকরা আসলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এবং আদালতের পক্ষ থেকেই কাজ করছিলেন। ফলে তাঁদের ভয় দেখানো মানে সরাসরি শীর্ষ আদালতের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা, যা আদালত অবমাননার পর্যায়েও পড়তে পারে।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও মন্তব্য করেন, এই ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলের একসুরে অবস্থান নেওয়া উচিত। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে এই ঘটনাকে “আইনের শাসনের মর্যাদার উপর আঘাত” বলে বর্ণনা করেন।
আদালতের নির্দেশ
ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে যেখানে যেখানে বিচারিক আধিকারিকরা এসআইআর-সংক্রান্ত শুনানি করবেন, সেখানে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। যে সব বিচারিক আধিকারিক নিজেদের বা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করবেন, তাঁদের বাড়িতেও প্রয়োজনে সুরক্ষা দিতে হবে।
শুনানি চলাকালীন ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্যও কড়া বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। আদালত জানিয়েছে, একসঙ্গে খুব সীমিত সংখ্যক মানুষকেই ওই ধরনের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে এবং বড় জমায়েত বরদাস্ত করা হবে না।
পাশাপাশি রাজ্যের মুখ্যসচিব, ডিজিপি, মালদহের জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারকে “নিষ্ক্রিয়তা”-র অভিযোগে নোটিস পাঠিয়ে ৬ এপ্রিল ব্যক্তিগতভাবে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত নির্বাচন কমিশনকে ঘটনাটির তদন্ত কেন্দ্রীয় সংস্থা, অর্থাৎ সিবিআই বা এনআইএ-র হাতে দেওয়ার পথও খুলে দিয়েছে।
কেন এসআইআর ঘিরে এত উত্তেজনা
এই ঘটনা মূলত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা ঘিরে তৈরি হওয়া বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ। নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক “লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি” বা তথ্যগত অসঙ্গতি চিহ্নিত হয়েছে, যার নিষ্পত্তির জন্যই এই প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাজ্যের শাসক শিবিরের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে বহু প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে। মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় সেই আশঙ্কা থেকেই ক্ষোভ তীব্র হয়েছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিবেদন ইঙ্গিত করছে।
এর আগেই ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট এক বিশেষ নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত শুনানির জন্য বিচারিক আধিকারিক নিয়োগের পথ খুলে দিয়েছিল। আদালত তখনই জানিয়েছিল, রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পরস্পর দোষারোপের জেরে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির জন্য বিচারব্যবস্থার অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সুপ্রিম কোর্ট যা বলেছে তা সঠিক, এবং মানুষকে উসকানিতে পা না দেওয়ার আবেদন জানান। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচন কমিশনের দিকেই আঙুল তোলেন এবং দাবি করেন, বিচারিক আধিকারিকদের সুরক্ষা দেওয়ার দায় কমিশন পালন করতে পারেনি।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, মডেল কোড জারি হওয়ার পর এবং নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপে প্রশাসনিক ক্ষমতার বড় অংশ রাজ্য সরকারের হাতছাড়া হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের রাজনৈতিক চক্রান্ত চলছে এবং অশান্তি তৈরি করে বাংলার নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার পরদিনও মালদহে জাতীয় সড়ক অবরোধ করে নতুন করে বিক্ষোভ হয়েছে। অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও ভোটার তালিকা ইস্যুতে জমে থাকা ক্ষোভ পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য
মালদহের এই ঘটনা শুধু একটি জেলার আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং নির্বাচন কমিশন, রাজ্য সরকার এবং বিচারব্যবস্থার মধ্যে ত্রিমুখী টানাপোড়েনকে আরও প্রকাশ্য করে দিল। বিশেষ করে বিচারিক আধিকারিকদের নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ রাজ্যের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বার্তা স্পষ্ট — ভোটার তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ যতই তীব্র হোক, বিচারিক দায়িত্ব পালনকারী আধিকারিকদের ঘেরাও, ভয় দেখানো বা আক্রমণ কোনওভাবেই সহ্য করা হবে না। আদালত যে এই ঘটনাকে সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার উপর প্রত্যক্ষ আঘাত হিসেবে দেখছে, বৃহস্পতিবারের পর্যবেক্ষণেই তা স্পষ্ট হয়েছে।
