নিজস্ব সংবাদদাতা | নয়াদিল্লি | ২ এপ্রিল ২০২৬
আাম আদমি পার্টি (আাপ) রাজ্যসভায় ডেপুটি লিডারের দায়িত্ব থেকে রাঘব চাড্ডাকে সরিয়ে দিতে রাজ্যসভা সচিবালয়কে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে এবং তাঁর জায়গায় পাঞ্জাবের সাংসদ অশোক মিত্তলকে বসানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে। শুধু পদ বদলই নয়, একই চিঠিতে আাপ দাবি করেছে—রাজ্যসভায় আর যেন রাঘব চাড্ডাকে আাপ কোটায় বক্তৃতার সময় বরাদ্দ না করা হয়; ফলে প্রশ্ন উঠছে, এটা কি শুধু সাংগঠনিক রদবদল, নাকি দলীয় এক বিশিষ্ট কণ্ঠস্বরকে সাইডলাইনে পাঠানোর কৌশলগত চেষ্টা।
রাজ্যসভা সচিবালয়কে কী জানাল আাপ
দলীয় সূত্রের খবর, রাজ্যসভায় আাপ-এর নেতা সঞ্জয় সিং-এর স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়েছে—দলের ডেপুটি লিডার হিসেবে রাঘব চাড্ডার পরিবর্তে অশোক মিত্তলকে স্বীকৃতি দিতে। পাশাপাশি উল্লেখ রয়েছে, পাঞ্জাব থেকে নির্বাচিত এই তরুণ সাংসদ রাঘব চাড্ডাকে ভবিষ্যতে আর আাপ কোটায় বক্তৃতার জন্য সময় না দেওয়ার অনুরোধও করা হয়েছে সচিবালয়ের কাছে, যা তাঁর সংসদীয় প্রোফাইলকে কার্যত ছেঁটে ফেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অশোক মিত্তল: নতুন ডেপুটি লিডার
রাঘবের উত্তরসূরি হিসেবে যাঁর নাম সামনে এনেছে আাপ, তিনি পাঞ্জাব থেকে নির্বাচিত রাজ্যসভার সাংসদ অশোক কুমার মিত্তল—লভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চ্যান্সেলর। কর্পোরেট ও শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিত্তল সংসদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিতে কাজ করেছেন এবং দলীয় শিবিরে তাঁকে ‘টেকনোক্র্যাট’ মুখ হিসেবেই দেখা হয়। নতুন দায়িত্ব নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানিয়েছেন, জাতীয় কনভেনর তাঁর উপর যে আস্থা রেখেছেন, তা রক্ষা করতে তিনি দলীয় অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে দেশের স্বার্থও জোরালোভাবে রাজ্যসভায় তুলে ধরবেন।
‘এক সময়ের তারকা মুখ’ রাঘব চাড্ডা, এখন কেন কোণঠাসা?
লোকপাল আন্দোলনের দিন থেকে আাপ-এর সঙ্গে রাঘব চাড্ডার পথচলা; অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মূল টিমে থেকে তিনি প্রথম সারির মুখপাত্র হয়ে ওঠেন, দিল্লি ও জাতীয় রাজনীতিতে দলের অন্যতম প্রচারমুখ হয়ে ওঠেন। ২০১৯-এর লোকসভা লড়াই, ২০২০-র দিল্লি বিধানসভা জয়, তারপর পাঞ্জাব থেকে সর্বকনিষ্ঠ রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে তাঁর উত্থান—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে তিনি আাপ-এর ‘পোস্টার বয়’ বলেই পরিচিত ছিলেন।
তবু গত এক বছর ধরে দলের নানা সঙ্কট, দিল্লি ও পাঞ্জাবে টানাপড়েন, এমনকি জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থেকেও তাঁর চোখে পড়ার মতো অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। দলীয় সূত্রের একাংশের দাবি, আাপকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক চললেও রাঘব প্রকাশ্যে মুখ না খোলায় এবং বিভিন্ন সময়ে তিনি ‘দলের নাগালের বাইরে’ থাকায় নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছিল।
আগের সাসপেনশন থেকে বর্তমান ‘নীরবতা’
এর আগে ২০২৩ সালে একটি নির্বাচিত কমিটি গঠনের প্রস্তাবে কয়েক জন সাংসদের নাম তাঁদের সম্মতি ছাড়াই যুক্ত করার অভিযোগে রাঘব চাড্ডাকে রাজ্যসভা থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। প্রায় চার মাস পরে সেই সাসপেনশন ওঠে এবং তিনি পুনরায় কার্যত সক্রিয় হন, কিন্তু বিতর্কে জড়ানোর পাশাপাশি তাঁর আগ্রাসী সংসদীয় স্টাইল তাঁকে বিরোধী শিবিরের নিশানায় রেখেছিল। এখন, যখন তাঁকে শুধু পদচ্যুতই নয়, কার্যত ‘মুখ বন্ধ’ করে দেওয়ার মতো অনুরোধ জানানো হয়েছে সচিবালয়কে, তখন সেই অতীত সাসপেনশন ও বর্তমান নীরবতার যোগসূত্র নিয়েই নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে।
‘সাধারণ রদবদল’ বলছে আাপ, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে
আাপ-এর প্রকাশ্য ব্যাখ্যা—এটি নিছক সাংগঠনিক রদবদল; সংসদীয় দলে একাধিক সাংসদকে সুযোগ করে দিতেই সময়ে সময়ে এ ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যদি এটা কেবল পদবদলই হত, তবে কেন একই সঙ্গে চিঠিতে রাঘব চাড্ডার বক্তৃতার অধিকার প্রায় খারিজ করার অনুরোধও থাকল? দলীয় একাংশের মতে, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে নেতৃত্বের স্পষ্ট বার্তা—রাজ্যসভায় আাপ-এর সরকারি লাইন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখন আর রাঘবের মতো তেজি, ক্যামেরা-বান্ধব মুখের প্রয়োজন নেই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, দিল্লি ও পাঞ্জাবে শাসন, আইনি লড়াই এবং জাতীয় রাজনীতিতে জোটের সমীকরণ—এই বহুস্তরীয় চাপে আাপ ধীরে ধীরে একটি সীমিত কোর গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করছে; রাঘব চাড্ডার মতো ‘তারকা মুখ’-কে সাইডলাইনে ঠেলে দেওয়া সেই প্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে।
সামনে কী দেখা যেতে পারে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—রাঘব চাড্ডা নিজে মুখ খুলবেন কি না। তিনি যদি নীরবতাই বজায় রাখেন, তাহলে তা দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব আরও বাড়াল বলে ধরা হবে; আর যদি প্রকাশ্যে অসন্তোষ বা ভিন্নমত জানান, তবে আাপ-এর ভেতরকার ফাটল নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক জেগে উঠতে বাধ্য। অন্য দিকে, নতুন ডেপুটি লিডার হিসেবে অশোক মিত্তল রাজ্যসভায় কতটা সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা নেন, আাপ কি তাঁকেই মুখ করে আগের মতো আক্রমণাত্মক লাইন ধরে রাখে, নাকি তুলনায় বেশি সঙ্কুচিত, কম আলোয় থাকা কৌশল বেছে নেয়—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
